27/04/2024
আশফিয়া- 'শিফাউন'-এর বহুবচন। শিফা অর্থ আরোগ্য বা cure। কুরআনুল কারীম এবং হাদীসে যেসব মেডিসিন এবং ঔষধি গাছ-গাছড়াকে বিশেষভাবে শিফা বা বরকতময় বলা হয়েছে, ৭ দিনের এই ডিটক্স প্রোগ্রামটি হচ্ছে সেগুলোর একটি সম্মিলিত প্রয়োগ। এজন্যই এটার নাম রাখা হয়েছে 'আল-আশফিয়া'; আরোগ্যসমগ্র অথবা The Collection of Cures! আমাদের আলোচ্য প্রেসক্রিপশনটি শাইখ আদিল বিন তাহির মুকবিল (হাফিযাহুল্লাহু)-এর দেওয়া। জাদু, জিন, বদনজর তো বটেই; এর পাশাপাশি অন্যান্য শারীরিক রোগব্যাধির চিকিৎসাতেও এটা খুব উপকারি।
ক. আমাদের যা যা দরকার হবে-
১. পানি (সাড়ে তিন বা চার লিটার) -যমযমের পানি হলে সবচেয়ে ভালো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এর মাঝে শিফা আছে।[২২৪] -নইলে বৃষ্টির পানি। আল্লাহ তাআলা এটাকে বরকতময় বলেছেন।[২২৫] -এসব না পেলে সাধারণ পানি হলেও চলবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণ পানিও চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করেছেন। [২২৬] যমযম বা বৃষ্টির পানি অল্প পরিমাণে থাকলে বরকতের জন্য সাধারণ পানির সাথে মিক্স করা যেতে পারে। আর একসাথে এত পানি রাখতে না পারলে প্রথমে ২লিটার পানি প্রস্তুত করুন। এটা ব্যবহার শেষে আবার প্রস্তুত করবেন। তবে এই পানির সাথে নতুন পানি মেশানো উচিত হবে না।
২. অলিভ অয়েল (১০০ মিলি লিটার) কুরআনুল কারীমে যাইতুনের তেলকে বরকতময় বলা হয়েছে।[২২৭] -সবচেয়ে ভালো হয় ফিলিস্তিনের এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল হলে। -নইলে শরীরে ব্যবহারের উপযোগী ভালো মানের যেকোনো অলিভ অয়েল।
৩. মধু (২৫০ গ্রাম) আল্লাহ তাআলা বলেছেন, মধুর মধ্যে মানুষের জন্য আরোগ্য রয়েছে। [২২৮] যথাসম্ভব খাঁটি মধু। এক্ষেত্রে পরিচিত কারও মাধ্যমে সংগ্রহ করতে পারেন। নির্ভরযোগ্য কোনো অনলাইন শপের সহায়তা নিতে পারেন। অথবা যেকোনো ভালো ব্র্যান্ডের মধু হতে পারে।
৪. কালোজিরা (৫০ গ্রাম) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কালোজিরা মৃত্যু ব্যতীত সকল রোগের আরোগ্য।[২২৯] এটাও ভালো মানের হওয়া উচিত, আর সম্ভব হলে ব্যবহারের আগে কালোজিরার ময়লা ঝেড়ে ফেলা উত্তম।
৫. তিলাওয়াতের জন্য কুরআন শরীফ আল্লাহ তাআলা বলেছেন, বিশ্বাসীদের জন্য কুরআনের মধ্যে রয়েছে শিফা এবং রহমত। [২৩০] এসব সংগ্রহ করা হয়ে গেলে আমরা কাজ শুরু করতে পারি। খ. প্রস্তুতকরণ উপকরণগুলো হাতের কাছে রেখে নিচের আয়াতগুলো পড়ুন এবং সেগুলোতে ফুঁ দিন-
১. সূরা ফাতিহা-৭বার অথবা ৩ বার
২. আয়াতুল কুরসী-৭ বার অথবা ৩ বার
৩. সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস-সব তিন বার করে
৪. সূরা বাকারা সম্পূর্ণ -
এক বসাতেই পুরোটা পড়ে শেষ করতে হবে-এমন বাধ্যবাধকতা নেই। একবারে যতটুকু পারবেন, পড়বেন। কোনো কাজ থাকলে প্রয়োজনে উঠে যাবেন। সেটা শেষ করে এসে বাকিটা পড়বেন। প্রয়োজনে দুই দিন সময় নিয়ে প্রস্তুত করবেন। এরপর ডিটক্স শুরু করবেন। -এই সূরাগুলো পড়ুন, আর মাঝে মাঝে পানি, অলিভ অয়েল, মধু এবং কালোজিরাতে ফুঁ দিন।
৫. শেষে কিছু দুআ এবং আয়াতে শিফা পড়ুন, যেগুলো শারীরিক অসুস্থতার রুকইয়ায় বলা হয়েছে। এছাড়া গ্রন্থের শেষে রুকইয়ার আয়াতের সাথে কিছু দুআ রয়েছে, সম্ভব হলে সেগুলোও দেখা যেতে পারে। উল্লখ্য, সূরা বাকারা পড়ার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুত্ব দিয়েছেন- حَدَّثَنِي أَبُو أَمَامَةَ الْبَاهِلِيُّ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ اقْرَءُوا سُورَةَ الْبَقَرَةِ فَإِنَّ أَخْذَهَا بَرَكَةً وَتَرَكَهَا حَسْرَةٌ وَلَا تَسْتَطِيعُهَا الْبَطَلَةُ قَالَ مُعَاوِيَةُ بَلْغَنِي أَنَّ الْبَطَلَةَ السَّحَرَةُ "আবু উমামা বাহিলি রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা সূরা বাকারা তিলাওয়াত করো। কেননা, তা গ্রহণ করা বরকতের এবং ছেড়ে দেওয়া আফসোসের। আর জাদুকররা তার সাথে পেরে ওঠে না। বর্ণনাকারী মুয়াবিয়া বলেন, আমার নিকট পৌঁছেছে, এখানে বাতিল অর্থ জাদুকর।"[২৩১] আর উল্লিখিত অন্য সূরাগুলোর ব্যাপারে পূর্বেও আলোচনা হয়েছে, যেমন: সূরা ফাতিহাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সত্য রুকইয়াহ। (আবূ দাউদ) অন্য একজন সাহাবীকে বলেছেন, তুমি কীভাবে জানলে, এটা রুকইয়াহ। (বুখারী) আয়াতুল কুরসী কুরআনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়াত (মুসলিম) এবং এটা শয়তান থেকে হেফাজতের মাধ্যম (বুখারী)। সূরা ইখলাস, ফালাক এবং নাস দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জন্য রুকইয়াহ করেছেন, অন্যদের ওপরও করেছেন। (বুখারী) এই ধাপগুলো ঠিকঠাক শেষ করে থাকলে বলা যায় যে, আপনি ৭ দিনের ডিটক্স প্রোগ্রাম শুরু করার জন্য প্রস্তুত।
গ. কীভাবে ব্যবহার করবেন? প্রথম তিনদিন
১. ঘুমের আগে মাথার তালু থেকে পায়ের তালু পর্যন্ত, অর্থাৎ পুরো শরীরে রুকইয়ার অলিভ অয়েল মেখে নিন।
২. এরপর সাতটা কালোজিরা চিবিয়ে খান। আধা গ্লাস (১২০-১২৫ মিলি) রুকইয়ার পানিতে এক চা চামচ মধু নিন, এরপর এটা গুলিয়ে খেয়ে ফেলুন।
৩. যথাসম্ভব সকাল-সকাল গোসল করবেন। গোসলের পানিতে প্রথমে এক গ্লাস (২২০ মিলি বা ১ পোয়া) রুকইয়ার পানি মিশিয়ে নিন। এরপর সাবান দিয়ে ভালোভাবে গোসল করুন।
৪. গোসলের পর আবার সাতটা কালোজিরা চিবিয়ে খান। তারপর আধ গ্লাস রুকইয়ার পানিতে এক চা চামচ মধু গুলিয়ে খেয়ে ফেলুন।
৫. সুস্থতা লাভের নিয়তে দিনের অন্য যেকোনো সময়ে কিছুক্ষণ রুকইয়াহ শুনুন, অথবা অভিজ্ঞ কারও পরামর্শ নিয়ে আপনার সমস্যা অনুযায়ী কোনো রুকইয়াহ শুনুন। পরের ৪ দিন মধু, পানি ও কালোজিরা খাওয়া এবং গোসলের ক্ষেত্রে একই নিয়ম অনুসরণ করুন। তবে ঘুমের আগে শরীরের যেসব জায়গায় সমস্যা কিংবা ব্যথা আছে, শুধু সে জায়গাগুলোতে অলিভ অয়েল মাখবেন।
[২৩১] মুসলিম: ১৩৩৭
[২২৭] সূরা নূর, আয়াত: ৩৫
[২২৮] সূরা নাহল, আয়াত: ৬৯
[২২৯] তিরমিযী: ২০৪১
[২৩০] সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ৮৬
[২২৪] আল-মুজামুল আওসাত
[২২৫] সূরা কাফ, আয়াত: ৯
[২২৬] আবূ দাউদ: ৩৮৮৫
বই: রুকইয়াহ।
পরিচ্ছদ: আল-আশফিয়া
পৃষ্ঠা: ২৩৯- ২৪২