26/04/2024
ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানের বিরতিতে উপস্থাপিকা “নাস্তা-পানি” “রিফ্রেশমেন্ট” “স্ন্যাকস্” না বলে “জল-খাবারের ব্যবস্থা আছে” ঘোষণা দেয়ায় কোন কোন শ্রোতার কাছে ‘জল’ শব্দটি তাদের কর্ণ-প্রদেশে চপেটাঘাতের মতো মনে করে সোশ্যাল মিডিয়ায় শোর তুলেছেন।
“নাস্তা-পানি” “রিফ্রেশমেন্ট” “স্ন্যাকস্” এগুলো কোন ভাষার শব্দ ! ‘খাবার’ তো ঠিকই আছে কিন্তু ‘জল’ কি দোষ করেছে - চলুন সেটা একটু ‘জল-ঘোলা’ করে দেখে নেই।
একটা বিষয় আমরা ভুলে যাই যে, বাঙালী মুসলমানদের তথা আমাদের প্রায় সব নিজেদের ৬/৭ কি বড়জোর ৯/১০ জেনারেশন পিছিয়ে গেলেই দেখা যাবে যে, তাঁরা ছিলেন নিম্নবর্ণের হিন্দু। ৪৮ এ দেশ বিভাজন পর্যন্ত উভয় বাংলা ও বর্তমান পাকিস্তান মিলিয়ে মুসলমানরা ছিলো সংখ্যালঘু। ব্রিটিশদের পূর্বে বহিরাগত মুসলিম সংখ্যালঘুরা ভারত শাসন করেছে কয়েক শতাব্দী। ব্রিটিশরা করেছে প্রায় দুইশত বছর। এসময় ভারতের মুসলমানরা অনেকটা কোনঠাসা হয়ে পড়ে আর উল্টাদিকে গোঁড়া ও বর্ণবাদী হিন্দু ধর্মের সংস্কার চলতে থাকে।
ভারত ভাগের মূল কারনই ছিলো সংখ্যাগুরু হিন্দুদের দ্বারা শাসিত হবার ভয়। হিন্দুরা তখনো মুসলমানদের ‘যবন’ তথা ম্লেচ্ছজাতি জ্ঞান করে। হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষের ঐতিহাসিক কারন এটাই। হিন্দু সনাতন ধর্ম আর ইসলাম নবীন ধর্ম সনাতন হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রীষ্টান ধর্মবলম্বীদের কখনো তার মাহাত্ম্য দিয়ে কখনো জোরপূর্বক কনভার্ট করতে থাকে।
উচ্চবর্ণের হিন্দুদের দ্বারা নীপিড়িত নিম্মবর্ণের হিন্দু যারা কনভার্টেড মুসলিম তাদের মধ্যে থাকা একটা স্বাভাবিক বিদ্বেষ/ রেষারেষি যা এখন পর্যন্ত আমরা দেখছি।
শব্দবিরোধ থেকেও এই বিদ্বেষের একগুঁয়েমিপনা যা প্রকৃত অর্থে আমাদের হিপোক্রিসি আর অতীতকেই মনে করিয়ে দেয়।
‘জল’ শব্দটি মূলত ভারতবর্ষের হিন্দু বাঙালিরা ব্যবহার করে থাকে। আর ‘পানি’ শব্দটি বাংলাদেশের কিছু হিন্দু ব্যতীত (কনভার্টেড কতিপয় খ্রীষ্টান, বৌদ্ধসহ) সকল ধর্মালম্বী ব্যবহার করে। অথচ ভারতীয় উপমহাদেশে বাদবাকি হিন্দুসহ বেশির ভাগ মানুষ ‘পানি’ শব্দ ব্যবহার করে থাকেন।
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে ‘জল’ এর দোষ হচ্ছে এটা বাঙালী হিন্দুদের ব্যবহারের শব্দ।
বাংলাদেশের বাঙালী মুসলমান ‘জল’ বললে অনেকের গাত্রদাহ হয়। অথচ হিন্দিভাষী হিন্দুদের ‘পানি’ শব্দেও আরাম বোধ হয় কারন এই শব্দটি পাকিস্তানীদের ক্ষুদ্রাংশের (৭%) ভাষা উর্দূতে ব্যবহৃত হয়। অথচ উর্দূ ভাষাটিও আদি সংস্কৃত, মাগধী-প্রাকৃত, অগ্নিপূজারী পারসিকদের ভাষার মিশ্রিত একটি রূপ। আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে ভারতে উর্দূভাষাভাষীর সংখ্যা পাকিস্তানের চেয়ে চার গুণের বেশি। ভারতে জম্মু-কাশ্মীর, জাতীয় ক্যাপিটাল টেরিটরী দিল্লী, বিহার, উত্তর প্রদেশ, ঝাড়খন্ড, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও পশ্চিমবঙ্গের কোন কোন রাজ্যে সংখ্যাগুরু, কোন কোনটায় দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাষা উর্দু।ভারতে উর্দূভাষীর সংখ্যা ছয় কোটির বেশি আর পাকিস্তানে দেড় কোটিরও কম।