06/05/2026
দুনিয়ার চিন্তা বনাম আখেরাতের চিন্তা: অন্তরের আলো-অন্ধকারের গল্প
“দুনিয়ার চিন্তা অন্তরে অন্ধকার সৃষ্টি করে, আর আখেরাতের চিন্তা অন্তরে নূর সৃষ্টি করে।” — হযরত উসমান (রা.)
মানুষের জীবনটা অদ্ভুত। বাইরে থেকে সব ঠিকঠাক দেখালেও ভেতরে অনেক সময় একটা অজানা অস্থিরতা কাজ করে। কেন এমন হয়? কারণ আমরা কী নিয়ে বেশি ভাবছি—সেটার ওপরই আমাদের অন্তরের অবস্থা নির্ভর করে।
আজকের দুনিয়ায় আমরা প্রায় সবাই কোনো না কোনো চিন্তায় ডুবে আছি। ব্যবসা কেমন চলছে, টাকা কিভাবে বাড়বে, ভবিষ্যৎ কী হবে, অন্যরা কোথায় পৌঁছে গেছে—এসব ভাবনা যেন আমাদের ঘিরে রাখে। ধীরে ধীরে এই চিন্তাগুলো আমাদের মনকে ভারী করে ফেলে। বাইরে হয়তো সফলতা আছে, কিন্তু ভেতরে শান্তি নেই।
দুনিয়ার চিন্তা খারাপ—এমন কথা নয়। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন দুনিয়াই আমাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে যায়। যখন আমরা ভাবতে শুরু করি—সব কিছু এখানেই, এই জীবনেই শেষ। তখন প্রতিটা ছোট বিষয়ও বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়। হারানোর ভয়, না পাওয়ার কষ্ট—এসব মিলিয়ে অন্তরটা অন্ধকার হয়ে যায়।
অন্যদিকে, যে মানুষ আখেরাতের কথা ভাবে, তার দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা হয়ে যায়। সে জানে—এই জীবন চিরস্থায়ী নয়, এটা একটা পরীক্ষা। এখানে যা কিছু করছি, সবকিছুর হিসাব একদিন দিতে হবে। এই ভাবনাটা মানুষকে হালকা করে দেয়।
তখন সে কাজ করে, কিন্তু কাজের মধ্যে ডুবে যায় না। সে উপার্জন করে, কিন্তু টাকার জন্য অস্থির হয় না। কারণ তার ভরসা থাকে আল্লাহর উপর। সে জানে—যা তার জন্য নির্ধারিত, তা সে পাবেই।
এই জায়গাটাই আসলে “নূর”। এটা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। অন্তর শান্ত থাকে, মন স্থির থাকে, ইবাদতে স্বাদ আসে। ছোট ছোট জিনিসেও তৃপ্তি পাওয়া যায়।
দুইজন মানুষ একই কাজ করতে পারে—একজন শুধু লাভ-লোকসান নিয়ে ব্যস্ত, আরেকজন আল্লাহর সন্তুষ্টির কথাও মাথায় রাখে। বাইরে থেকে তারা একই, কিন্তু ভেতরের পার্থক্যটা বিশাল। একজনের অন্তর চাপ আর অস্থিরতায় ভরা, আরেকজনের অন্তর প্রশান্ত।
আমাদের ভুলটা এখানেই—আমরা দুনিয়াকে অন্তরে বসিয়ে ফেলেছি। অথচ দুনিয়া থাকার জায়গা হাতের মধ্যে, অন্তরের মধ্যে না। অন্তরের জায়গা হওয়া উচিত আখেরাতের জন্য।
জীবনটা এমনভাবে গড়তে হবে, যেখানে আমরা দুনিয়ার কাজও করব, আবার আখেরাতের কথাও ভুলব না। ব্যবসা করব, কিন্তু হালাল-হারামের খেয়াল রাখব। পরিকল্পনা করব, কিন্তু আল্লাহর উপর ভরসা রাখব।
শেষ কথা হলো—
দুনিয়া যতই বড় মনে হোক, এটা ক্ষণস্থায়ী। আর আখেরাত যতই দূরের মনে হোক, সেটাই আসল জীবন।
তাই যদি সত্যিকারের শান্তি চাই, তাহলে চিন্তার দিকটা একটু বদলাতে হবে। দুনিয়াকে প্রয়োজন অনুযায়ী জায়গা দিতে হবে, আর আখেরাতকে দিতে হবে অগ্রাধিকার।
তখনই অন্তরের অন্ধকার দূর হবে, আর নূরের আলো ধীরে ধীরে জায়গা করে নেবে।