19/01/2026
লাস পালমাস।
আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে জেগে উঠা গ্রান্ড ক্যানারী আইল্যান্ডের একটি দ্বীপ। রাত ১০টার পর মনে হচ্ছিলো পুরো শহরটা হুড়মুড় করে জেগে উঠেছে। রাস্তায় এতো মানুষ দেখে মনে হচ্ছিলো আজ এ শহরে কোন উৎসব হবে হয়তবা। অথচ না, এটাই নাকি এই দ্বীপের প্রতি রাতের চিত্র। সারা পৃথিবী থেকে হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসে এই দ্বীপে শুধু রাতভর আনন্দ করার জন্য।
ডেভিড আমাকে প্রথমে ওর এপার্ট্মেন্টে নিয়ে এলো। আজ বিকেলেই ওর সাথে আমার পরিচয় সাগর পাড়ে। কি করবো কোথায় যাবো এসব ভেবে একা একাই সাগর পাড়ে বসে অস্থির ঢেউএর আনন্দ উপভোগ করছিলাম। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম পাশের বেঞ্চেও একজন আমার মতো উদাস মনে সাগরের দিকে চেয়ে বসে আছে। লাইটার আছে কিনা প্রশ্ন করে ওর বেঞ্চে বসলাম। পরিচয় হলো। এ দ্বীপেরই বাসিন্দা ও। কয়েক মাস হলো কিউবা হতে প্রবাস জীবন শেষ করে এখানে এসে থিতু হয়েছে। বাবা মা কোথায় আছে, বেঁচে আছে কিনা জানে না। ভাই বোনরা বিভিন্ন দেশে থাকে। বউ বাচ্চা নেই। নিজের এপার্ট্মেন্টে সে একাই থাকে। আরো ৪টা এপার্ট্মেন্ট আছে তার এই দ্বীপে, যেগুলোর ভাড়া দিয়ে তার মাস চলে যায় দিব্যি। সন্ধ্যা হলে রাস্তায় এতো লোক কেন জিজ্ঞেস করাতে ওই আমাকে বলল, “এ শহরটা এমনই”। এখানে সবাই রাতভর আনন্দ স্ফূর্তি করে বারে, রেস্ট্রুরেন্টে, আলোকিত সাগর পাড়ে, রাস্তার মোড়ে, মাঠের কোনে সবখানে।
ঘর সংসার নেই কেন জানতে চাইলে সে উলটা আমাকেই একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করলো। দশ বছর বিদেশে থেকে অর্থ সম্পদ যা জমিয়েছে, তা কেন একটা মহিলাকে দিয়ে তাকে স্ফুর্তি করার জন্য ? ক’দিন পর হবে ছেলেমেয়ে, তখন বাদবাকী সম্পদও লুটে পুটে খাবে তারা! হাহ ! সারা জীবন কি আমি এদের জন্যই কস্ট করে এই সম্পদ অর্জন করলাম ?
কি ভয়ঙ্কর কথা! আমি ওর কথা শুনে ভীষণ ধাক্কা খেলাম। কোন পরিস্থিতিতে মানুষ জীবনকে এভাবে দেখতে পারে আমি ভেবে পেলাম না। ডেভিড আমাকে বেল্কুনিতে নিয়ে গেলো। পাশের বিল্ডিংএর প্রবেশদ্বারে পুলিশ আর এম্বুল্যেন্সের দিকে দেখিয়ে বলল, ওই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা এক বুড়ো, ৮/১০ দিন আগে থেকে মরে নিজ ঘরে পড়েছিলো, পঁচে দুর্গন্ধ বেড়নোর পর আজ ক্লিনিং কর্মীরা এসেছে তার মরদেহ নিতে। লোকটার বউ ওকে ছেড়ে গেছে সে অনেক বছর। ছেলেমেয়ে আছে বলে শুনেছি, কিন্তু দেখিনি কখনো। বন্ধু বান্ধবীরা ফোনে না পেয়ে পুলিশকে খবর দিয়েছে। অথচ এই লোকটি তার যৌবন এবং জীবনের সব সম্পদ ব্যয় করেছিলো তার বউ আর ছেলেমেয়েদের জন্য । নয় কি?
আমি ঘটনা আর ডেভিডের কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম!
দেশে আমার বাসায় রেখে আসা আমার মায়াময়ী বৃদ্ধ মা, ফুটফুটে পরীর মত মেয়ে আর সুন্দরী লক্ষী বউএর কথা মনে পড়ল। আমার হৃদয়, স্বপ্ন আর কল্পনা জুড়ে থেকে ওরাই তো আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে এই বিদেশ বিভূঁইয়ে। অথচ ডেভিডের মাথায় এসবের কোন বালাই নেই। ও যেন অন্য কোন গ্রহের প্রানী। ডেভিডের কথায় আমি এই প্রথম পশ্চিমা সভ্যতার কদর্য রুপটা দেখলাম। ডেভিডের জন্য মায়া হলো ।
এ প্রসঙ্গে কথা না বাড়িয়ে বললাম, ‘চলো শহরে যাবে না ?’ ও মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যা যাবই তো। এই শহরের রেস্ট্রুরেন্ট আর বারগুলো চলেই তোমাদের জন্য, চালায়ও তোমাদের মত বাইরের লোকেরা, ওখানে যে বারবনিতারা আনন্দ দিতে আসে তারাও তোমাদের মত বাইরেরই, যে ড্রিংক্স আর খাবার পরিবেশন করা হয় তাও বাইরের! আমরা যারা দ্বীপবাসী এভাবে ঘরে পড়ে মরে থাকি, আমাদের কোথাও যেতে ভালো লাগেনা। আমি ভীষণ আহত হলাম। ডেভিডের কথাগুলো আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করলো! কি অদ্ভুত’ এই দুনিয়া ! বাইরে থেকে এতক্ষন মনে হচ্ছিলো এ এক উৎসব মুখর শহর, অথচ ভিতরে ভিতরে সেকি ভয়ানক মৃত নগরী এটা!
বিদেশ থেকে ফিরে এসেছি অনেক বছর হলো।গতকাল এক বয়োঃজ্যৈষ্ঠ অফিসারের সাথে গল্প করছিলাম। আমার মত তিনিও অবসর নিয়েছেন অনেক বছর হলো। ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার বানিয়ে আমেরিকা পাঠিয়েছেন। ছেলে ওদেশেরই এক মেয়েকে পছন্দ করেছে। ওখানেই এখন বাড়ী কিনার জন্য টাকা চাঁচ্ছে, আর দেশে ফিরবে না। মেয়েকে ডাক্তার বানিয়ে বিয়ে দিয়েছেন আরেক প্রবাসী ডাক্তার ছেলের সাথে। মেয়েও হয়তবা দেশে ফিরবে না। সরকার থেকে পাওয়া প্লটে ৮তলা একটা বিল্ডিং তৈরী করেছিলেন অনেক যত্ন করে, বর্তমানে তারই একটা ফ্ল্যাটের একটা রুমে থাকেন তারা। তার ফ্ল্যাট থেকে কয়েক ফ্ল্যাট দুরেই একই ধরনের ঘটনা ঘটে গেলো কদিন আগে। ওই ফ্ল্যাটে অবসর প্রাপ্ত এক কর্মকর্তা একাই ছিলেন। বউ কানাডায় মেয়ের সাথে থাকে। দুই ছেলে বিদেশ থাকে। অফিসারটা মরে পড়েছিলো নিজ ঘরে। তিনদিন পর পুলিশ এসে মৃতদেহ উদ্ধার করে।
দুঃখভরা কণ্ঠে বলছিলেন তিনি, ছেলেমেয়েদের দেশে ফিরে আসতে অনুরোধ করেছেন অনেকবার। কারোরই নাকি এসব ফ্ল্যাট ফ্লুটের দরকার নেই। বিক্রি করে বরং টাকা পাঠালেই খুশী। কি কস্ট করেই না তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন এই সংসারটা। কিন্তু কি হলো শেষ পর্যন্ত! জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ঘরে এখন শুধু তিনি একা আর চার যুগ আগে বিয়ে করা বউ। এতো কলরব, জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী,ঘরোয়া পার্টি, ঘর গোছানো, নানান ব্যস্ততার সব বন্ধ হয়ে গেছে । ভীষণ একা লাগে। সব চেয়ে বেশী কস্ট হয় রাতের বেলা, যখন ঘুম আসতে চায় না। যখন নিকষ অন্ধকার রাত নিঃশব্দে আস্ত গিলে ফেলতে চায় জী্বনটাকে। বার বার মনে হয় জীবনে এত কস্ট করে এতো কিছু করার কি দরকার ছিলো।
ডেভিডের কথা মনে পড়ে। সেদিনের সেই বেলাভুমিতে সে কি এই কথাই বলেছিলো আমাকে?
View in group