19/10/2026
ফিরে পাওয়ার লড়াই
একজন কৃষক বাবার স্বপ্ন, আর তার মেয়ের হারিয়ে যাওয়া শৈশব
গ্রামের ছোট্ট মাটির ঘরটায় সেদিন রাতে ঘুম আসছিল না গোলাম মোস্তফার। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, দূরের বাঁশঝাড়ে বাতাসের শব্দ। ঘরের এক কোণে স্ত্রী ঘুমিয়ে আছে, আর পাশে শুয়ে আছে এগারো বছরের ছোট্ট মেয়ে মেঘা।
মোস্তফা পেশায় একজন কৃষক। অন্যের জমিতে দিনভর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যা আয় করেন, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে। কোনো দিন হাঁড়িতে ভাত থাকে, কোনো দিন থাকে না। অভাব যেন তাঁর সংসারের নিত্যদিনের সঙ্গী।
তবু মেয়েকে নিয়ে তাঁর স্বপ্ন ছিল অনেক।
তিনি চাইতেন, মেঘা অন্তত তাঁর মতো অভাবের সঙ্গে লড়াই করে জীবন কাটাবে না। দুবেলা পেট ভরে খাবে, ভালো জামাকাপড় পরবে, একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াবে।
কিন্তু স্বপ্ন দেখলেই তো আর স্বপ্ন পূরণ হয় না। অভাব যখন ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে, তখন অনেক সময় একজন বাবাকে বুকের ভেতর পাথর চাপা দিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা তাঁর নিজের হৃদয়কেও রক্তাক্ত করে।
একদিন পরিচিত একজনের মাধ্যমে খবর পেলেন, ঢাকার উত্তরায় একটি অভিজাত বাসায় ছোট শিশুকে দেখাশোনা করার জন্য একজন মেয়ের প্রয়োজন। সেখানে থাকলে খাওয়া-পরার কষ্ট হবে না, কিছু টাকাও পাওয়া যাবে।
মোস্তফা প্রথমে রাজি হতে চাননি। তাঁর এগারো বছরের মেয়েটা এত দূরে শহরে একা থাকবে কীভাবে? কিন্তু অভাবের হিসাব তাঁকে বারবার হারিয়ে দিচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত মেয়েকে শহরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।
বিদায়ের দিন মেঘা বাবার হাত শক্ত করে ধরে বলেছিল, “আব্বা, তুমি আমাকে রেখে চলে যাবে না তো?”
মোস্তফা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, “কাঁদিস না মা। তুই ভালো থাকবি। কিছুদিন কষ্ট কর, তারপর তোকে আবার নিয়ে আসব। তোর জন্য নতুন জামা কিনব, স্কুলে ভর্তি করব।”
মেয়ের চোখের পানি লুকিয়ে তিনি সেদিন বাসে তুলে দিয়েছিলেন তাকে।
তিনি জানতেন না, নিজের হাতে মেয়েকে তুলে দিচ্ছেন এক অন্ধকার জীবনের দিকে।
শহরের আলিশান বাড়ি, আর এক শিশুর নরকবাস
উত্তরার নয় নম্বর সেক্টরের বিশাল ফ্ল্যাটটি বাইরে থেকে দেখতে ছিল স্বপ্নের মতো। চকচকে মেঝে, দামি আসবাব, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘর—সবকিছুতেই আভিজাত্যের ছাপ।
কিন্তু সেই বাড়ির ভেতরেই ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকল মেঘার শৈশব।
তার কাজ ছিল বাড়ির ছোট শিশুটিকে দেখাশোনা করা, ঘর গোছাতে সাহায্য করা এবং গৃহকর্ত্রীর নানা নির্দেশ পালন করা। সামান্য ভুল হলেই গৃহকর্ত্রী বীথি আক্তারের রাগ গিয়ে পড়ত তার ওপর।
কখনো চড়-থাপ্পড়, কখনো বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মারধর, কখনো গরম খুন্তির ছ্যাঁকা—এগারো বছরের শিশুটির কোমল শরীর হয়ে উঠেছিল নিষ্ঠুরতার শিকার।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল সেই অন্ধকার বাথরুম।
কোনো কারণে গৃহকর্ত্রী রেগে গেলে অনেক সময় মেঘাকে বাথরুমে আটকে রাখা হতো। দরজা বন্ধ করে দেওয়া হতো, নিভিয়ে দেওয়া হতো আলো। ভেতরে থাকত না কোনো খাবার, থাকত না কারও সান্ত্বনা। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার।
মেঘা দরজায় হাত রেখে কাঁদত।
“আম্মা, দরজাটা খোলো। আমার ভয় লাগছে। আমি আর ভুল করব না।”
কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসত না।
সে ছোট ছোট হাত দিয়ে দরজায় আঘাত করত। কখনো দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে আসা সামান্য আলো দেখত, কখনো কান পেতে বোঝার চেষ্টা করত কেউ আসছে কি না।
সময় যত গড়াত, তার ভয় তত বাড়ত।
ক্ষুধায় পেট মোচড় দিত। গলা শুকিয়ে আসত। অন্ধকারে বসে সে দুই হাঁটু বুকে জড়িয়ে রাখত। কখনো মনে হতো, এই দরজা বুঝি আর কোনো দিন খুলবে না।
তখনই তার মনে পড়ত গ্রামের বাড়ির কথা।
মাটির উঠোন, পাশের পুকুর, বাবার ঘামে ভেজা শার্ট, সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় বাবার হাতে নিয়ে আসা সামান্য মুড়ি কিংবা গুড়।
সেই সামান্য জিনিসগুলোই তখন তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি সম্পদ মনে হতো।
মেঘা অন্ধকারে বসে ফিসফিস করে বলত, “আব্বা, তুমি আমাকে নিতে আসো না কেন? আমি তোমার কাছে যাব। আমি আর শহরে থাকব না।”
কিন্তু তার বাবা জানতেন না, তাঁর মেয়ে প্রতিদিন অন্ধকারের ভেতর বসে তাঁর জন্য কাঁদছে।
বাবার কাছে লুকানো সত্য
গ্রামে তখনও মোস্তফা মেয়ের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতেন। মাঠে লাঙল চালাতে চালাতে ভাবতেন, এবার ধান বিক্রি করে কিছু টাকা জমাবেন। মেয়েকে দেখতে গেলে তার জন্য ভালো কিছু নিয়ে যাবেন।
মাঝেমধ্যে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে শহরে যেতেন। কিন্তু বাবা আসার খবর পেলেই মেঘাকে পরিয়ে দেওয়া হতো ঢিলেঢালা জামাকাপড়। শরীরের ক্ষতগুলো আড়াল করা হতো। তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হতো, বাবার কাছে যেন কোনো অভিযোগ না করে।
বাবাকে দেখলে মেঘার বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না বেরিয়ে আসতে চাইত। সে বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে বলতে চাইত, “আব্বা, আমাকে নিয়ে যাও। এখানে আমার খুব কষ্ট হয়।”
কিন্তু ভয় তাকে চুপ করিয়ে দিত।
সে ভাবত, সত্যি কথা বললে আবার মার খেতে হবে। আবার সেই অন্ধকার বাথরুমে আটকে রাখা হবে।
মোস্তফা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, “মা, তুই ভালো আছিস তো?”
মেঘা চোখ নামিয়ে বলত, “হ্যাঁ, আব্বা।”
একটি ছোট্ট মিথ্যা শুনে কৃষক বাবাটি নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যেতেন। তিনি বুঝতেই পারেননি, তাঁর মেয়ের সেই ‘হ্যাঁ’-এর আড়ালে কত শত কান্না লুকিয়ে ছিল।
৩১ জানুয়ারি: যে দিন বাবার পৃথিবী ভেঙে গেল
দিনের পর দিন নির্যাতন আর অনাহারে মেঘার শরীর ভেঙে পড়তে লাগল। একসময় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বাড়ি থেকে বাবাকে ফোন করা হলো—মেয়েটি অসুস্থ, তাকে নিয়ে যেতে হবে।
খবর পেয়েই মোস্তফা ছুটে এলেন।
কিন্তু মেয়েকে দেখে তাঁর পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল।
এই কি তাঁর সেই ছোট্ট মেঘা? যে একদিন বাবার হাত ধরে গ্রামের মেলায় যেতে চাইত? যে রাতে ভয় পেলে বাবার পাশে এসে ঘুমাত?
মেয়ের শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন। মুখে ক্লান্তি। চোখে এমন এক আতঙ্ক, যা কোনো শিশুর চোখে থাকার কথা নয়।
মোস্তফা মেয়েকে বুকে টেনে নিলেন।
“মা, তোর কী হয়েছে? কে তোকে এমন করেছে?”
এবার মেঘা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। বাবার বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে লাগল।
কান্নার ফাঁকে ফাঁকে বেরিয়ে এল তার জমে থাকা কষ্টের কথা—মারধর, গরম খুন্তির ছ্যাঁকা, খাবার না পাওয়া, অন্ধকার বাথরুমে আটকে থাকার ভয়।
মোস্তফা নির্বাক হয়ে শুনছিলেন।
যে মেয়েকে তিনি একটু ভালো রাখার আশায় শহরে পাঠিয়েছিলেন, সেই মেয়েই সেখানে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে পড়েছে।
তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে শুধু বললেন, “মা, আমাকে মাফ করে দিস। আমি জানতাম না। আমি তোকে ভালো রাখতে চেয়েছিলাম।”
সেদিন একজন দরিদ্র কৃষকের বুকের ভেতর যে কান্না জমেছিল, তা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
নিজের দারিদ্র্যের কাছে হেরে গিয়ে মেয়েকে শহরে পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কখনো ভাবেননি, সেই শহরেই তাঁর মেয়েকে এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
বিচার শুধু আদালতের নয়, সমাজেরও
মেঘাকে হাসপাতালে নেওয়ার পর বিষয়টি সামনে আসে। পুলিশি তদন্ত শুরু হয় এবং চারজনকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়। বীথি আক্তার ও সুফিয়ার বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ এবং তাঁদের দায় স্বীকারের বিষয়টি আলোচনায় আসে। অন্যদিকে সাবেক এমডি সাফিকুর রহমান দাবি করেন, তিনি কিছুই জানতেন না। কার কী দায়, তা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আদালত।
কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—এগারো বছরের একটি শিশু কীভাবে দিনের পর দিন এমন নির্যাতনের শিকার হলো? বাড়ির চার দেয়ালের ভেতর তার কান্না কি কেউ শুনতে পায়নি?
মেঘা এখন গাজীপুরের একটি ছোট্ট মাদ্রাসায় নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করছে। তার সামনে বই আছে, পাশে অন্য শিশুরা আছে। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া শৈশব কি এত সহজে ফিরে আসে?
অন্ধকার ঘর দেখলে তার পুরোনো ভয় ফিরে আসে কি না, বন্ধ দরজার শব্দে বুক কেঁপে ওঠে কি না—সেই কষ্ট হয়তো সে কাউকে বলতে পারে না।
তার বাবা এখনো কৃষিকাজ করেন। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে জমিতে কাজ করেন। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া এখন আর নতুন ঘর বানানো কিংবা জমি কেনা নয়।
তিনি চান, তাঁর মেয়ে আবার হাসতে শিখুক।
রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাক। পেট ভরে খাক। স্কুলে যাক। অন্য শিশুদের মতো স্বপ্ন দেখুক।
আর যারা তাঁর মেয়ের শৈশব কেড়ে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে যেন ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।
গ্রামের সেই দরিদ্র কৃষক আজ বুঝেছেন, অভাবের কষ্ট যত বড়ই হোক, একটি শিশুর নিরাপত্তা ও শৈশবের কোনো বিকল্প নেই।
মেঘার গল্প তাই শুধু একজন বাবার অসহায়ত্বের গল্প নয়। এটি আমাদের সমাজের কাছে একটি প্রশ্ন—দারিদ্র্যের কারণে কোনো শিশুকে কি তার শৈশব হারাতে হবে?
কোনো বাবা যেন আর অভাবের তাড়নায় মেয়েকে দূরে পাঠিয়ে এমন অনুশোচনায় না পোড়েন। কোনো শিশু যেন আর বন্ধ বাথরুমের অন্ধকারে বসে বাবাকে ডেকে কাঁদতে না হয়।
কারণ একটি শিশুর জন্ম শুধু অন্যের বাড়িতে কাজ করার জন্য নয়। তারও অধিকার আছে পড়াশোনা করার, খেলাধুলা করার, ভালোবাসা পাওয়ার এবং নিরাপদে বড় হয়ে ওঠার।
মেঘার শরীরের ক্ষত হয়তো একদিন শুকিয়ে যাবে। তার মনের ভয় কাটাতেও সময়, যত্ন ও ভালোবাসা প্রয়োজন।
কিন্তু তার শৈশবের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো আর ফিরবে না।
আর সেই সত্যটাই একজন কৃষক বাবার বুকের ভেতর সারাজীবন নীরব কান্না হয়ে বেঁচে থাকবে।
একটি শিশুকে কাজের মানুষ হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখুন। কারণ দারিদ্র্য তার পরিচয় হতে পারে, কিন্তু নির্যাতন কখনোই তার নিয়তি হতে পারে না।