20/03/2025
আমরা ছোটবেলা ইয়াসির আরাফাতকে মনে করতাম ফিলিস্তিনের অবিসংবাদিত নেতা। কিন্তু সে যে কী ছিলো সেটা বুঝতে ভালোই বড় হতে হয়েছে। নতুন প্রজন্মের অনেকে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের সংঘাতের প্রকৃতি বুঝতে পারে না। তাদের জন্য কিছু বেইসিক ইনফরমেশন দিচ্ছি এই পোস্টে। এর মাধ্যমে হয়তো তারা সহজে বিষয়টি ক্যাচ করতে পারবে যে কেন মুসলমানরা আল-আকসার একমাত্র বৈধ অভিভাবক ও ফিলিস্তিনের ভূমির প্রকৃত মালিক।
আল-আকসা মসজিদ ও ফিলিস্তিনের মালিকানা নিয়ে পশ্চিমারা নানা বিতর্ক তুললেও, ইতিহাস, ধর্ম, এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক আইন সবই মুসলমানদের অধিকারকে সমর্থন করে। সহজভাবে বোঝানোর জন্য, নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তুলে ধরা হলো।
ধর্মীয় কারণ:
১। পবিত্র স্থান ও প্রথম কিবলা
মক্কা ও মদিনার পর আল-আকসা মসজিদ ইসলাম ধর্মের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান।
রাসুল (সা.) মেরাজের রাতে এই মসজিদ থেকে আকাশে গমন করেন। কুরআনের (সূরা ইসরা ১৭:১) মাধ্যমে আল্লাহ নিজেই এর পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন।
মুসলমানরা প্রথমে এই মসজিদের দিকে ফিরেই নামাজ পড়তেন, অর্থাৎ এটাই ছিলো আমাদের প্রথম কিবলা। পরে কিবলা পরিবর্তন হয়ে কাবা শরীফ হয়। কিবলা পরিবর্তন হলেও এর পবিত্রতা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণই আছে।
২। ইসলামি আইন অনুযায়ী এটা ওয়াক্ফকৃত সম্পত্তি
ইসলামে ওয়াক্ফ বলতে বোঝায়, যখন কোনো সম্পত্তি একবার ধর্মীয় কাজে দান করা হয়, তখন তা চিরকাল সেই ধর্মের লোকদের অধীনেই থাকে। একবার ওয়াক্ফ হয়ে গেলে, তা কোনোভাবেই অন্য ধর্মের লোকদের হাতে বা নিয়ন্ত্রণে যেতে পারে না।
৬৩৭ সালে মুসলমানরা যখন জেরুজালেম দখল করে, তখন থেকেই আল-আকসা ওয়াক্ফ সম্পত্তি হিসেবে ইসলামি প্রশাসনের অধীনে ছিলো।
২. ঐতিহাসিক কারণ
১। ৬৩৭ সালে মুসলিম বিজয়
খলিফা উমর (রা.) এর শাসনামলে মুসলিমরা জেরুজালেম বিজয় করেন। স্বয়ং খলিফা উমরের কাছে খৃষ্টান ধর্মের নেতারা আল আকসার চাবি হস্তান্তর করেন। তখন তিনি সেখানে বসবাসকারী খ্রিস্টানদের অন্যান্য উপাসনালয় রক্ষা করেন, কিন্তু আল-আকসাকে কেবল মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত করেন।
২। দীর্ঘ ১৩০০ বছর মুসলিম শাসন
মুসলমানরা ৬৩৭ সাল থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত (১,৩০০ বছর) টানা ফিলিস্তিন শাসন করে। এই সময়ের মধ্যে কোনো ইহুদি সরকার ছিল না এবং ইহুদিরা ফিলিস্তিনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না।
৩। ক্রুসেডার যুদ্ধ ও সালাহউদ্দিন আইউবি
১০৯৯ সালে খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করেছিল, কিন্তু তারা ৮৮ বছর পর সালাহউদ্দিন আইউবির (রহ.) হাতে পরাজিত হয় (১১৮৭ সালে)। তিনি আবার ফিলিস্তিন মুসলমানদের হাতে ফিরিয়ে দেন।
৩. ইসরায়েলের দখলদারিত্ব সকল বিবেচনায়ই অবৈধ
১। ব্রিটিশ শাসন ও বেলফোর ঘোষণা (১৯১৭)
ব্রিটিশরা ১৯১৭ সালে ফিলিস্তিন দখল করে এবং ইহুদিদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা করে।
ব্রিটিশ সরকার ইহুদিদের সাহায্য করার জন্য বেলফোর ঘোষণা দেয়, কিন্তু এটি ছিল অবৈধ কারণ ব্রিটেনের কোনো অধিকার ছিল না অন্যদের জমি অন্য কাউকে দেওয়ার।
২। জাতিসংঘের আইন লঙ্ঘন
তবুও পরিবর্তিত বাস্তবতায়, কেবল তর্কের খাতিরেও যদি জাতিসংঘ এবং প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইনকে ভ্যালিড হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, তারা সে আইনও মানেনি।
১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে দুটি ভাগে বিভক্ত করার প্রস্তাব দেয় (UN Resolution 181) – এক অংশ ইহুদিদের জন্য এবং এক অংশ ফিলিস্তিনিদের জন্য।
কিন্তু ইসরায়েল ১৯৪৮ সালে শক্তি প্রয়োগ করে পুরো ফিলিস্তিন দখল করতে শুরু করে। ১৯৬৭ সালে তারা জোরপূর্বক পূর্ব জেরুজালেম দখল করে, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে অবৈধ।
জাতিসংঘের রেজুলেশন ২৪২ (১৯৬৭) ইসরায়েলের দখলকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং তাদের ফিলিস্তিন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
৩। বর্তমান আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
জাতিসংঘসহ প্রায় ১৩৮টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এমনকি ইসরায়েলের দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমকেও জাতিসংঘ ফিলিস্তিনের অংশ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।
অতএব মুসলমানরাই ফিলিস্তিনের প্রকৃত ভূমির মালিক। এখানে ইসরায়েল সম্পূর্ণ গায়ের জোরে, পশ্চিমাদের মদদে মুসলমানদের ভুমি অবৈধভাবে দখল করে আছে এবং ভুমির মালিকদের উপর গণহত্যা চালাচ্ছে।
© Ahmed Rafique