03/09/2025
✅বাংলাদেশের জমি পরিমাপ
✅স্কয়ার ফিট থেকে কাঠায় রুপান্তরের গল্প
বাংলাদেশে জায়গা এবং জমি শুধু একটি মাপের একক নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের পরম আকাংখিত স্বপ্ন বুণনের প্রতীক। বাড়ি বানানো, ফ্ল্যাট কেনা বা এই জাতীয় নতুন কোনো কাজ শুরু করার আগে আমরা প্রথমেই যে প্রশ্নে আটকে যাই তা হলো জায়গা বা জমির পরিমাপের হিসাবের ক্ষেত্রে, নিচে আমরা সেই বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা করব।
জমির এককের প্রকারভেদ, বৈচিত্র্য ও সংজ্ঞা;
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা আবিষ্কার করি বাংলাদেশে জমির পরিমাপ শুধু জ্যামিতিক হিসাবে বা বইয়ের ভাষায় সব সময় নির্ধারিত না হয়ে বরং বিভিন্ন অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং প্রচলিত আঞ্চলিক নিয়ম অনুযায়ী আলাদা আলাদা ভাবে নির্ধারিত হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে জমির এককের জাতীয় এবং আঞ্চলিক অনেক রকমের প্রকারভেদ থাকলেও আমরা এই আলোচনায় জমি পরিমাপের আট প্রকারের একক নিয়ে আলোচনা করব;
১. বর্গফুট (স্কয়ার ফিট)
২. বর্গমিটার (স্কয়ার মিটার)
৩. অযুতাংশ
৪. শতক বা শতাংশ (ডেসিমেল)
৫.কাঠা
৬. বিঘা
৭. একর
৮. হেক্টর
বিস্তারিত আলোচনা বা ব্যাখ্যা:
✅বর্গফুট (স্কয়ার ফিট): আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ক্ষুদ্রতম একক হলো বর্গফুট, যা দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ১ ফুট করে জায়গা নিয়ে গঠিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে শহুরে রিয়েল এস্টেট ব্যাবসায় ফ্ল্যাট, প্লট, জমি ও ভবনের আয়তন মাপতে এই এককটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই পরিমাপের ধরন সমগ্র পৃথিবীতে একই রকম হয়ে থাকে।
✅বর্গমিটার (স্কয়ার মিটার): আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত একটি ছোট মেট্রিক একক হলো বর্গমিটার, যা দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ উভয় দিকে ১ মিটার করে জায়গা নিয়ে গঠিত হয়ে থাকে। স্থাপত্য, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সরকারি নথিপত্রে এই এককের বেশি ব্যবহার দেখা যায়। ১ বর্গমিটারে ১০.৭৬৪ বর্গফুট জায়গা থাকে।
✅অযুতাংশ: শতাংশ ও সহস্রাংশের চেয়ে জমি পরিমাপের ক্ষুদ্রতম একটি একক হলো অযুতাংশ । এক অযুতাংশ জমিতে ৪.৩৪ বর্গফুট বা প্রায় ০.৪০৪৬ বর্গমিটার জমি হয়।
✅শতাংশ: শতাংশ হলো সরকারী ভাবে চালুকৃত বাংলাদেশের সর্বত্র প্রচলিত জমি পরিমাপের একক, ১০০ অযুতাংশে ১ শতাংশ, এবং ১ শতাংশে ৪৩৫.৬ বর্গফুট বা ৪০.৪৭ বর্গমিটার হয়। জমির খতিয়ান ও দলিলপত্রে সাধারণত শতাংশ বা ডেসিমেল হিসাব ব্যবহৃত হয়। শতকের মাপ সাধারণত বাংলাদেশের সর্বত্র একই রকম হয়।
✅কাঠা: শহরে জমি কেনাবেচা বা প্লট মাপার ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত একটি পরিমাপের একক হলো কাঠা, যা বাংলাদেশের প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজব্যাবস্থা থেকে উঠে এসে মূল ধারায় যুক্ত হওয়া একটি একক। ১ কাঠায় ঢাকা এবং চট্টগ্রামে ৭২০ বর্গফুট বা ৬৬.৮৯ বর্গমিটার পরিমান জমি হয়, কিন্তু রাজশাহী, রংপুর ও উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায় ১ কাঠায় ১,৬০০ বর্গফুট বা ১৪৮.৬৪ বর্গমিটার জমি হয়, এই হিসাবের সাথে আবার কুমিল্লা, খুলনা বা বরিশাল অঞ্চলের হিসাব নাও মিলতে পারে, যারফলে জমির কাগজপত্রে কাঠার মান কোন অঞ্চলের হিসাব অনুযায়ী হচ্ছে তা না জানা থাকলে ভুল বোঝাবুঝির সৃস্টি হতে পারে। তবে সহজ ও সাধারণ হিসাবে; ১৬ ছটাকে ১ কাঠা, ১.৬৫ শতাংশে ১কাঠা এবং ১৬৫ অযুতাংশে ১ কাঠা হয়।
✅বিঘা: বড় আকারের জমি পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী একটি একক হলো বিঘা। বাংলাদেশে এই এককের ব্যাবহার মোগল আমল থেকে চলে আসছে। ঢাকায় ১ বিঘায় ২০ কাঠা বা ১৪,৪০০ বর্গফুট অথবা ১,৩৩৭.৮ বর্গমিটার হলেও রাজশাহী, রংপুর ও উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায় ১ কাঠায় যেহেতু ১,৬০০ বর্গফুট বা ১৪৮.৬৪ বর্গমিটার জমি হয় সেক্ষেত্রে উত্তরবঙ্গের ওই অঞ্চলগুলোয় ১ বিঘায় ৩২,০০০ বর্গফুট বা ২৯৭২.৮৯ বর্গমিটার পর্যন্ত হয়ে যায় যা আবার কুমিল্লা, খুলনা বা বরিশাল অঞ্চলের হিসাবের সাথে মিলবে না। তবে বাংলাদেশের সর্বত্রই ২০ কাঠায় ১ বিঘা হয়।
✅একর: একর আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত একটি জমির পরিমাপক যা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জমি পরিমাপ করার একক হিসেবে ব্যাবহার হয়ে আসছে। ১ একরে ৪,৮৪০ বর্গগজ, ৪৩,৫৬০ বর্গফুট, বা প্রায় ৪,০৪৬.৮৮ বর্গমিটার এবং ০.৪০৪৬৮৬ হেক্টর, এটি সাধারণত বাংলাদেশে ১০০ শতাংশ বা প্রায় ৩.০৩ বিঘা জমির সমান। একর সাধারণত বড় কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং কৃষি জমি পরিমাপ করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
✅হেক্টর: হেক্টর (hectare) হলো জমি পরিমাপ করার মেট্রিক একক, যা প্রধানত বনভুমি এবং বিশেষ করে কৃষি জমি পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত হয়। এক হেক্টরে 10,000 বর্গ মিটার বা ২.৪৭ একরের সমান জমি হয়। হেক্টরের অন্যান্য পরিমাপগুলো হলো; ১ হেক্টরে ১০,০০০ বর্গ মিটার, ১ হেক্টরে ২.৪৭ একর (প্রায়), ১ হেক্টরে ৭.৪৭ বিঘা (প্রায়)।
✅সহজ পদ্ধতিতে টেবিলের মাধ্যমে জমি পরিমাপের এককগুলো বর্গফুট ও বর্গমিটারে রূপান্তর করে প্রকাশ;
নং এককের নাম পরিমান (বর্গফুট) পরিমান (বর্গমিটার)
১. ১ বর্গমিটার ১০.৭৬৪ বর্গফুট
২. ১ অযুতাংশ ৪.৩৪ বর্গফুট .৪০৪৬ বর্গমিটার
৩. ১ শতাংশ ৪৩৫.৬ বর্গফুট ৪০.৪৭ বর্গমিটার
৪. ১ কাঠা ৭২০ বর্গফুট ৬৬.৮৯ বর্গমিটার
৫. ১ বিঘায় ১৪,৪০০ বর্গফুট ১,৩৩৭.৮ বর্গমিটার
(২০ কাঠা)
৬. ১ একরে ৪৩,৫৬০ বর্গফুট৪, ০৪৬.৮৮ বর্গমিটার
(৪,৮৪০ বর্গগজ)
৭. ১ হেক্টর ১০৭৬৩৯ বর্গফুট ১০,০০০ বর্গ মিটার
✅জেনে রাখা ভালো;
# রেজিস্ট্রেশন, খতিয়ান ও দলিলে সাধারণত শতক (ডেসিমেল) ব্যবহার হয়।
# ডেভেলপাররা (প্লট/ফ্ল্যাট বিক্রেতা) সাধারণত কাঠা বা স্কয়ার ফিট ব্যবহার করে।
# ফলে জমি কেনার সময় দু’পক্ষের একক মিলে যাচ্ছে কিনা তা যাচাই করা জরুরি।
#রাজউকে ছাড়পত্র ও প্লান পাশ করানোর সময় নকশার সাথে যে সকল কাগজপত্র যুক্ত করতে হবে;
১. যাবতীয় দলীল
২. পর্চা/খতিয়ান (সি এস, আর এস, এস এ, মহানগর)
৩. খাজনা রশিদ
৪. মিউটেশন (নামজারী)
৫. জমা ভাগের প্রস্তাব পত্র
৬. মৌজা ম্যাপ
৭. এন আই ডি
৮. ছবি (পাসপোর্ট সাইজ)
৯. টিন সার্টফিকেট (যদি থাকে)
১০. নকশা (এমোনিয়া ড্রয়িং ২ সেট)
১১. অনলাইন আবেদনের কপি
✅এছাড়াও যদি অন্য কোন কাগজ-পত্রের প্রয়োজ হয় তাহলে রাজউক থেকে আবেদন কারীকে জানানো হয়ে থাকে।
ভোক্তদের জন্য পরামর্শ:
✅ জমি কেনার আগে জানতে হবে কোন অঞ্চলের মান অনুযায়ী জমির হিসাব করা হয়েছে।
✅ কাগজপত্রে (দলিল, রেজিস্ট্রি) শতক মান অনুযায়ী পরিমাপ মিলিয়ে নিন।
✅ ডেভেলপারের দেয়া কাঠা বা বর্গফুট হিসাব সরকারি নথির সাথে মিল আছে কিনা তা যাচাই করুন।
✅ ছোট জমি প্ল্যান করার সময় স্থপতির সাথে স্কয়ার ফিট ভিত্তিক মাপ ব্যবহার করুন।
পরিশেষে বলা যায়, জমির সঠিক পরিমাপ নির্নয় করতে জানা থাকলে যে শুধু বেচা-কেনার হিসাব করার জন্য সুবিধা হবে তা নয় বরং এই বিশেষ দক্ষতা প্রত্যেক মানুষের ব্যাক্তি ও সমাজ জীবনে নানারকম সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 1point6D প্রতিটি প্রজেক্টে শুরু করার আগে জমির প্রকৃত মাপ, জমির পরিবেশগত অবস্থান এবং অন্যান্য সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে স্থাপনাকে দৃষ্টিনন্দন করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করে যাতে স্থাপনা হয় স্বপ্নময় ও কার্যকরী।
তাই 1point6D বিশ্বাস করে, একখণ্ড জমি শুধুমাত্র একটি পরিমাপের একক নয়, প্রত্যেক মানুষের কাছে জমি ক্রয় এবং বাড়ি নির্মাণ হলো পরম আকাংখিত একটি স্বপ্ন পূরনের নাম, যে স্বপ্নের নান্দনিক রুপ দান করে 1point6D’র চৌকষ স্থপতি এবং প্রকৌশলী টিম।