01/05/2026
া_মে_২০২৬ইং #মহান_মে_দিবস ও #আন্তর্জাতিক_শ্রমিক_দিবসে পৃথিবীর সকল শ্রমিকদের জন্য শুভকামনা ও আত্মত্যাগী শ্রমিকদের প্রতি জানাচ্ছি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
◆ "১লা মে" দিনটি পৃথিবীর প্রায় অনেক দেশেই "আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস" হিসেবে পালিত হয়, যা "মে দিবস" নামেও পরিচিত।
বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই এ দিনটি সরকারীভাবে ছুটির দিন। ১৮৮৬ইং সালের 'মে' মাসে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের এক ঐতিহাসিক আন্দোলন ও আত্মাহুতির ফলে এইদিনকে শ্রদ্ধাভরে স্মরন করা হয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশে পালিত হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় এইদিনটি পালিত হয় না।
#শ্রমিকঃ
সভ্যতার কারিগর। বিশ্ব সভ্যতার প্রতিটি ইঁট, বালু, পাথরে যাদের ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জড়িয়ে আছে, তারাই শ্রমিক। কিন্তু সেই 'শ্রমিক' কখনই সভ্যতার আশীর্বাদধন্য শ্রেনী ছিলনা।
এখনোও কি আছে?
জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন ?
#মহান_মে_দিবস_এর_ইতিহাসঃ
উনিশ শতকের গোড়ার দিকের কথা।
শ্রমিকরা তখনো শোষিত, সপ্তাহে ৬ দিনের প্রতিদিনই গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘন্টার অমানবিক পরিশ্রম করতো, কিন্তু তার বিপরীতে মিলতো নগন্য মজুরী। অনিরাপদ পরিবেশে রোগ-ব্যধি, আঘাত, নির্যাতন ও মৃত্যুই ছিল তাদের নির্মম সাথী। তাদের পক্ষ হয়ে তখন বলার মতো কেউ ছিলনা।
১৮৬০ইং সালে শ্রমিকরাই মজুরি না কেটে দৈনিক ৮ ঘন্টা শ্রম নির্ধারনের প্রথম দাবি জানায়। কিন্তু তখন কোন শ্রমিক সংগঠন ছিলনা বলে এই দাবী জোরালো করা সম্ভব হয়নি। সেই সময় 'সমাজতন্ত্র' শ্রমজীবি মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে। শ্রমিকরা বুঝতে পারে, বণিক ও মালিক শ্রেণীর এই রক্ত শোষণ নীতির বিরুদ্ধে তাদের সংগঠিত হত হবে। ১৮৮০-৮১ইং সালের দিকে শ্রমিকরা প্রতিষ্ঠা করে "Federation of Organized Trades and Labor Unions of the United States and Canada" । পরে ১৮৮৬ইং সালে সংঘটির নাম পরিবর্তন করে করা হয়, "American Federation of Labor"। এই সংঘের মাধ্যমে শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে শক্তি অর্জন করতে থাকে।
১৮৮৪ইং সালে সংঘটি "৮ ঘন্টা দৈনিক মজুরি" নির্ধারনের প্রস্তাব পেশ করে এবং মালিক ও বণিক শ্রেণীকে এই প্রস্তাব কার্যকরের জন্য ১৮৮৬ইং সালের ১লা মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। তারা এই সময়ের মধ্যে সংঘের আওতাধীন সকল শ্রমিক সংগঠনকে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংগঠিত হওয়ার পুনঃপুনঃ আহবান জানায়। প্রথম দিকে অনেকেই একে অবাস্তব, অভিলাষ, অতি সংস্কারের উচ্চাকাঙ্খা বলে আশংকা প্রকাশ করে। কিন্তু বণিক-মালিক শ্রেণীর কোনো ধরনের সাড়া না পেয়ে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে প্রতিবাদী ও তাদের প্রস্তাব বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে থাকে। এ সময় 'এলার্ম' নামক একটি পত্রিকার কলাম "একজন শ্রমিক ৮ ঘন্টা কাজ করুক কিংবা ১০ ঘন্টাই করুক, সে দাসই" যেনো জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালে। শ্রমিক সংগঠনদের সাথে বিভিন্ন সমাজতন্ত্রপন্থী দলও একাত্মতা জানায়। '১লা মে' কে ঘিরে প্রতিবাদ, প্রতিরোধের আয়োজন চলতে থাকে। আর শিকাগো হয়ে উঠে এই প্রতিবাদ প্রতিরোধের কেন্দ্রস্থল।
১লা মে এগিয়ে আসতে লাগলো। একসময় মালিক-বণিক শ্রেণী অবধারিতভাবে ঐ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
ইতিপূর্বে ১৮৭৭ইং সালে শ্রমিকরা একবার রেলপথ অবরোধ করলে, পুলিশ ও ইউনাইটেড স্টেটস্ আর্মি তাদের উপর বর্বরচিত আক্রমন চালায়। ঠিক একইভাবে '১লা মে' কে মোকাবেলায় আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রস্তুতি চলতে থাকে। পুলিশ ও জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। স্থানীয় বণিক-মালিকগণ শিকাগো সরকারকে অস্ত্র সংগ্রহে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করে। ধর্মঘট আহবানকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য শিকাগো বানিজ্যিক ক্লাব ইলিনয় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ২০০০ ডলারের মেশিন গান কিনে দেয়।
ঠিক ১লা মে সমগ্র যুক্ত্ররাষ্ট্রে প্রায় ৩০০,০০০ জন শ্রমিক তাদের কাজ ফেলে ঐদিন রাস্তায় নেমে আসে। শিকাগোতে শ্রমিক ধর্মঘট আহবান করা হয়। প্রায় ৪০,০০০ জন শ্রমিক কাজ ফেলে শহরের কেন্দ্রস্থলে সমবেত হয়। অগ্নিঝরা বক্তৃতা, মিছিল, মিটিং, ধর্মঘট, বিপ্লবী আন্দোলনের হুমকি সবকিছু মিলে ১লা মে উত্তাল হয়ে উঠে। পার্সন্স, জোয়ান মোস্ট, আগস্ট স্পীজ, লুই লিং সহ আরো অনেকেই শ্রমিকদের মাঝে পথিকৃত হয়ে উঠেন। ধীরে ধীর আরো শ্রমিকরা কাজ ফেলে আন্দোলনে যোগ দেয়। একসময় আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১লক্ষ।
আন্দোলন চলতে থাকে। ৩রা মে, আবার কারো কারো মতে ৪ঠা মে ১৮৮৬ইং সালের সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর 'হে' মার্কেট বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকরা মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। আগস্ট স্পীজ তখন জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলছিলেন। হঠাৎ দূরে দাঁড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরন ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হয় এবং ১১ জন আহত হয়, পরে আরো ৬ জন মারা যায়। পুলিশবাহিনীও তখন শ্রমিকদের উপর অতর্কিতে হামলা শুরু করে, যা সাথে সাথেই রায়টের রূপ নেয়। রায়টে ১১ জন শ্রমিক শহীদ হয়। পুলিশ হত্যা মামলায় আগস্ট স্পীজ সহ আটজন শ্রমিক কে অভিযুক্ত করা হয়। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ইং সালের ১১ই নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লুই লিং ফাঁসির একদিন পূর্বেই কারা অভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন ও অন্য একজনের পনেরো বছরের কারাদন্ড হয়।
ফাঁসির মঞ্চে আরোহনের পূর্বে আগস্ট স্পীজ বলেছিলেন, "আজ আমাদের এই নিঃশব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে"।
পরবর্তীতে ২৬শে জুন, ১৮৯৩ইং ইলিনয়ের গভর্ণর অভিযুক্ত আট শ্রমিককেই নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেন, এবং রায়টের হুকুম প্রদানকারী সেই পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। আর অজ্ঞাত সেই বোমা বিস্ফোরণকারীর পরিচয় কখনোই প্রকাশ পায়নি।
শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের "দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করার দাবি" অফিসিয়ালভাবে স্বীকৃতি পায়। আর পহেলা মে বা মে দিবস প্রতিষ্ঠা পায় শ্রমিকদের দাবী আদায়ের দিন হিসেবে।
পৃথিবীব্যাপী আজও তা পালিত হয়ে আসছে।
শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনের উক্ত গৌরবময় অধ্যায়কে স্মরণ করে ১৯৮০ইং সাল থেকে প্রতি বছরের ১লা মে বিশ্বব্যাপী পালন হয়ে আসছে “মে দিবস” বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস”।
প্রতি বছরের 'পহেলা মে' সেই আন্দোলনের কথাই আমাদের স্বরণ করিয়ে দেয়।
১৮৯০ইং সালের ১৪ই জুলাই অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিষ্ট কংগ্রেসে ১লা মে "শ্রমিক দিবস" হিসেবে ঘোষনা করা হয় এবং তখন থেকে অনেক দেশে দিনটি শ্রমিক শ্রেণী কর্তৃক উদযাপিত হয়ে আসছে। রাশিয়া'সহ পরবর্তীকালে আরো কয়েকটি দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হবার পর মে দিবস এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন। জাতিসংঘে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শাখা হিসাবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে শ্রমিকদের অধিকার সমূহ স্বীকৃতি লাভ করে এবং সকল দেশে বণিক-মালিক ও শ্রমিকদের তা মেনে চলার আহবান জানানো হয়। এভাবে শ্রমিক ও মালিকদের অধিকার সংরক্ষণ করা হয়। বাংলাদেশও আইএলও কর্তৃক প্রণীত নীতিমালায় স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রমিক শ্রেনীর প্রাধান্যের কারনে অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক দেশে বেশ গুরুত্ব সহকারে মে দিবস পালন করে। বাংলাদেশে মে দিবস সরকারি ছুটি হিসাবে পালিত হয়।
#মহান_মে_দিবস_এর_অঙ্গীকারঃ
আমার মতে "মে দিবস" কে শুধু আলোচনা, অগ্নিঝরা বক্তৃতা, র্যালী, সেমিনারে সীমাবদ্ধ রাখা নয়, আসুন আমরা সম্মিলিতভাবে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্য্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করি। এই দিবসের সার্থকতা সেখানেই।
মে দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য...
“শ্রমিক-মালিক ঐক্য গড়ি
স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলি”-
মহান মে দিবসের এ প্রতিপাদ্যের আলোকে শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্কের মাধ্যমে
প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করাই আমাদের অঙ্গীকার- শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।"
আমার মতে আজকের মহান মে দিবস এর শ্লোগান হোক,
■ বাংলাদেশ'সহ বিশ্বের সকল মেহনতি শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার প্রতিষ্ঠা হোক, এবং সেইসাথে
■ সারা বিশ্বে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক।