13/09/2026
নোনা জলের বাসন্তী গাঁয়ে আমাদের মতো গরিব ঘরের ছেলেদের কোনো রঙিন স্বপ্ন দেখতে নেই। বাবা যখন বুক সমান নদীর জলে নেমে মীন ধরতো, আমি তখন ভাঙা ডিঙি নৌকো নিয়ে চরের গরান বনের দিকে কাঠ কুড়োতে যেতাম। নুন আনতে পান্তা ফুরানো এই সংসারে আমার জীবনের একমাত্র শান্তি ছিল— কুসুম। ওর কোনো দামি গয়না ছিল না, পরনে থাকতো সস্তা সুতির শাড়ি। কিন্তু আমি ভালোবেসেছিলাম খেয়া পারাপারের সময় নদীর নোনা বাতাসে ওর ওই অলৌকিক চোখের পলক ফেলাতে।কুসুম যখন প্রতিদিন বিকেলের খেয়ায় আমার নৌকোয় উঠতো, চরের সব ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে যেত। ও নৌকোর এক কোণে চুপচাপ বসে জলের দিকে তাকিয়ে থাকতো, আর আমি ভাঙা দাঁড় টানতে টানতে আড়চোখে দেখতাম ওর চোখের পাতার ওপর এসে পড়া বিকেলের শেষ নরম রোদ। যেই ও আলতো করে চোখের পলক ফেলতো, আমার মনে হতো এই নোনা গাঙের বুকেই আমার একটা আস্ত স্বর্গ নেমে এসেছে।আমাদের প্রেমটা শহরের মতন কোনো দামি ক্যাফেতে বসে কফি খাওয়ার ছিল না। আমাদের প্রেম ছিল ভাঙা নৌকোর গলুইতে বসে একটা সস্তার লেবেনচুষ ভাগ করে খাওয়া। কোনোদিন মুখে বড় বড় ভালোবাসার কথা বলা হয়নি, শুধু চোখের ভাষায় আমরা একে অপরকে ভালোবেসেছিলাম। আমি ঠিক করেছিলাম, এবার শীতে যখন নদীর জল কমবে, তখন একটু বেশি করে কাঠ কুড়িয়ে হাটে বেচে কুসুমের জন্য লাল পেড়ে একটা শাড়ি কিনবো। তারপর ওর বাবার হাত ধরে বলবো— "আমি কুসুমকে ভালো রাখি বা না রাখি, ওরে ছাড়া আমি বাঁচবো না।"কিন্তু আমাদের মতো গরিবের কপালে সুখ সয় না...সে বছর আশ্বিনের শেষে আকাশ কালো করে এলো, আর সেই সাথে মাতলা নদীর রাক্ষুসে বান। গ্রামের মাটির বাঁধ ভেঙে হুড়মুড় করে নোনা জল ঢুকতে শুরু করলো। কুসুমদের মাটির ঘরটা ছিল নদীর একদম পাড়ে। মাঝরাতে যখন চারদিকে হাহাকার আর চিৎকার শুনলাম, আমি নিজের জানের তোয়াক্কা না করে ঝড়ের মধ্যে নৌকো নিয়ে ছুটলাম ওদের ঘরের দিকে।দূর থেকে দেখলাম, ওদের খড়ের চালটা জলের তোড়ে ভেসে যাচ্ছে। কুসুম চালের একটা বাঁশ ধরে বাঁচার জন্য ছটফট করছে। আমি মরিয়া হয়ে দাঁড় টেনে নৌকোটা ওর কাছে নিয়ে গেলাম। চিৎকার করে বললাম, "কুসুম, আমার হাতটা শক্ত করে ধর!"কুসুম কাঁপা কাঁপা নোনা হাতে আমার হাতটা ধরলো। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে একটা মস্ত বড় গাছের গুঁড়ি এসে ধাক্কা মারলো আমার পুরোনো নৌকোয়। নৌকোটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। আমি জলের তলা থেকে কোনোমতে ভেসে উঠে কুসুমকে টেনে এক টুকরো কাঠের ওপর তুললাম। কুসুম তখন শীতে আর ভয়ে কাঁপছে। ও আমার দিকে তাকালো, ওর চোখের পাতায় তখন নোনা জল আর বৃষ্টির জল মিশে এক হয়ে গেছে। ও শেষবারের মতো আমার দিকে তাকিয়ে আলতো করে একটা চোখের পলক ফেললো... ঠিক যেমনটা ও প্রতিদিন বিকেলে নৌকোয় বসে আমার দিকে তাকিয়ে ফেলতো। তারপর একটা তীব্র জলের স্রোত ওকে আমার হাত থেকে ছিঁড়ে নিয়ে অতল নদীর বুকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।আমি বাঁচলাম, কিন্তু আমার কুসুম আর ফিরে এলো না।আজ তিন বছর কেটে গেছে। বাসন্তী গ্রামে এখন আবার নতুন করে মাটির বাঁধ তৈরি হয়েছে, নদীও শান্ত। কিন্তু প্রতিটা বিকেলের জোয়ারে আমি যখন একা নদীর চরে আসি, আমার চোখের সামনে শুধু কুসুমের সেই শেষ চাউনিটা ভেসে ওঠে। গ্রামের মানুষ বলে, আমি নাকি পাগল হয়ে গেছি। কারণ আমি নাকি মাঝনদীতে ভাঙা নৌকোর গলুইয়ের দিকে তাকিয়ে একা একাই কথা বলি, একা একাই কাঁদি।ওরা বোঝে না, আমি তো কুসুমের শরীরটাকে ভালোবাসিনি। আমি ভালোবেসেছিলাম তার শেষবার চোখের পলক ফেলাতে... আর সেই পলক ফেলার মুহূর্তে বাসন্তীর এই নোনা গাঙের বুকেই আমার জীবনের সময়টা চিরকালের জন্য থমকে গেছে।— সমাপ্ত
—
কলমে: জীবন
Comment pat 2